সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ সংঘাতের প্রভাবে সমুদ্রপথে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। খবর রয়টার্স।
আইএমএফের মুখপাত্র জুলি কোজাক গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে জানান, সংস্থাটি এখন পর্যন্ত কোনো সদস্য দেশের কাছ থেকে জরুরি অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক আবেদন পায়নি। তবে আইএমএফ সদস্য দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে এবং প্রয়োজনে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
কোজাক জানান, যুদ্ধের প্রভাব কতটা গভীর হবে তা নির্ভর করবে এর স্থায়িত্ব ও তীব্রতার ওপর। আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির যে হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে, সেখানে এ যুদ্ধের প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা হবে। গত এক মাসে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি সার সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় খাদ্যপণ্যের দামও অনেক বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে এবং এ অবস্থা এক বছর স্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দশমিক ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উৎপাদন দশমিক ১ থেকে দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলে ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পার হলেও এখনো থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহ পথ সচল রাখতে এবং বাজার স্থিতিশীল করতে ইউরোপীয় দেশগুলো ও জাপান সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে; যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় শেয়ারবাজারের পতন ঘটেছে এবং বন্ডের ইল্ড বেড়েছে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লেও অনেক উদীয়মান অর্থনীতির দেশের মুদ্রার বিনিময় হার কমেছে।
আইএমএফের প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে, এ যুদ্ধ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে। বিশেষ করে ইরানি হামলায় কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি ক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটির বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এছাড়া লেবাননের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অবকাঠামো এ যুদ্ধের কারণে আরো সংকটে পড়েছে। তবে মিসরের অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রভাব সীমিত রয়েছে এবং দেশটি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইএমএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটি আহ্বান জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি যেন শুধু জ্বালানি তেলের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য পণ্য ও সেবার খাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মনে ভবিষ্যতে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা যেন জেঁকে না বসে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি মনে করে, যদি সময়মতো পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তবে জ্বালানি তেলের এ মূল্যবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।